কোলকাতা আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসব ২০২২
দাবদাহ লাইভ, ঋদ্ধি ভট্টাচার্য, কলকাতাঃ ২০১৬ সালে সমাদ্দারের চাবি এবং গলকধাম রহস্য উপর ভিত্তি করে এক শীতের দিনে এসেছিল ডবল ফেলুদা। ঠিক একই ভাবে ২০২২-এর এপ্রিলের পর সিনেমা প্রেমীদের কাছে আরও একবার কল্পতরু হয় দাড়ালো পশ্চিমবঙ্গ সরকার। একই বছরে দুই বার আন্তর্জাতিক চলচিত্র উৎসব কোলকাতায়। উৎসব উদযাপন হল ১৫ থেকে ২২-শে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এবারের উৎসবে যেমন ছিল দেখার মতো ঠিক তামনি মুগ্ধ করেছে এবারের পোস্টারগুলো। ‘পথের পাঁচালি’-র ‘অপু’, ‘দ্য কিড’-এর চ্যাপলিন ,‘ফরেস্ট গাম্প’-এর টম হ্যাঙ্কস , ‘শোলে’-র অমিতাভ কিংবা সবার প্রিয় ‘ফেলুদা’। আলাদা আলাদা ভাষায়, ভিন্ন জ্যঁরের এই চলচ্চিত্রগুলির এক একটি চরিত্র কালজয়ী। সিনেমার নেশায় বুঁদ কিছু মানুষের কাছে এই চরিত্রগুলি অত্যন্ত কাছের। কিন্তু, সত্যজিতের ‘নায়ক’-এর সঙ্গেই এক ফ্রেমে চলে এসেছেন গোদারের ‘প্যাট্রিসিয়া’। কিংবা ‘ফরেস্ট গাম্প’-এর পার্কের বেঞ্চে টম হ্যাঙ্কসের সঙ্গে গল্প করছেন ‘ফেলুদা’। ভাবতে অবাক লাগলেও এমনটাই বাস্তবে করে দেখিয়েছে বিজ্ঞাপন সংস্থা জেনেসিস অ্যাডভার্টাইসিং প্রাইভেট লিমিটেড। তাদের তৈরি কোলাজে কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের মন্তাজ চমকে দিয়েছে সিনেপ্রেমীদের।এই পোস্টারগুলির থিমের সঙ্গে মিল রেখেই নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিশ্ব মেলে ছবির মেলায়।’ ‘ধন্যি মেয়ে!’ প্রায় পাঁচ দশক পরেও কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে যেন সেই সাতের দশকের হিট ছবি ‘ধন্যি মেয়ে’-র স্পষ্টবক্তা মনসাকেই দেখল কলকাতা। নেতাজি ইনডোর স্টেডিয়ামে ২৮ তম কলকাতা চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনে বাংলায় এসে স্বামী অমিতাভকে কটাক্ষ করে একের পর এক মন্তব্য জয়া বচ্চনের। ঠিক যেমনটা বাপের বাড়ি এসে করে থাকেন মেয়েরা। এছাড়াও উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন শারুখ খান, অরিজিৎ সিংহ, রানি মুখার্জি সহ আরও অনেকে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল আকর্ষণ হয় পরে গায়ক অরিজিৎ সিং-এর গাওয়া “রঙ দে তু মুরে গেরুয়া”। সাত্যাজিত রায় শরক বক্তৃতা দেন পরিচালক শ্রী সুধির মিশ্রা। বহু সিনেমা ছিল দেখার মতো কিন্তু তার মধ্যে থেকে দর্শকদের মন জিতে নিয়েছে বাংলাদেসের অভিনেতা শ্রী চঞ্চল চৌধুরির অভিনিত “হওয়া” ছবি এবং পাকিস্তানের ছবি “জয়ল্যান্ড ” যার জন্য নন্দন চত্বরে উপছে পড়েছিলো মানুষের ঢল এবং সিনেমাটি আরেকবার দেখানর জন্য দর্শকমহল থেকে অনুরধ করা হয়। ১৮-ডিসেম্বর এই উৎসবের মরশুমের মধ্যেই আবার জমে ওঠে আর্জেন্টিনা বনাম ফ্রান্স-এর খেলা। যেখানে নাটকীয় ভাবে যেতে আর্জেন্টিনা এবং যেটি তাদের ছিল তৃতীয় জয়। তারপর ২২-শে ডিসেম্বর নেয়ম মেনে পালন হয় সমাপ্তি অনুষ্ঠান। সেই অনুষ্ঠানে শুরুতেই ঘটে চমক প্রদান একটি ঘটনা। তাঁর নাম ঘোষণা হতেই দর্শকাসনে বসেই প্রথমে জ্যাকেটটি খুলে ফেললেন। ব্যাগ থেকে বের করলেন নীল-সাদা জার্সি। পিছনে লেখা মেসি। রবীন্দ্রসদনে উপস্থিত দর্শকদের মুখে তখন ‘মেসি’র জয়গান। না এটা কোনও স্পোর্টস ইভেন্টের দৃশ্য নয়। ২৮ তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের সমাপ্তি অনুষ্ঠানে এমন দৃশ্যের সাক্ষী থাকল কলকাতা। এই বছর সেরা পরিচালকের পুরস্কার পেলেন ‘হিটলারস উইচ’ ছবির জন্য আর্জেন্তিনার আর্নেস্টো আরদিতো ও ভিরনা মলিনা। পুরস্কার গ্রহণ করতে মেসির জার্সি পরেই মঞ্চে উঠলেন মলিনা। তখন তাঁর গাল বেয়ে নেমে আসছে আনন্দাশ্রু। পুরস্কার হাতে বললেন, ‘এটা আমাদের কাছে শুধু বিশ্বকাপ নয়।’ এভাবেই হয়তো একটা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বোধহয় দেশ-কালের সমস্ত সীমারেখা অতিক্রম করে যায়। বিকেলে রবীন্দ্রসদনে শুরু হল উৎসবের সমাপ্তি অনুষ্ঠান। শুরুতে পুরুলিয়ার ছৌ-নাচ পরিবেশন করলেন যুধারাম কুমার। এদিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, ইন্দ্রনীল সেন, রাজ চক্রবর্তী, ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত, হরনাথ চক্রবর্তী, জুন মালিয়া, পাওলি দাম প্রমুখ। উৎসব কমিটির চেয়ারম্যান রাজ চক্রবর্তী বলেন, ‘এই বছর চলচ্চিত্র উৎসবে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবনাতেই পটশিল্পের আদলে সাজসজ্জা হয়েছে।’ অরূপ বিশ্বাস বলেন, ‘বিশ্বের আর কোনও চলচ্চিত্র উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ২০-২৫ হাজার দর্শক আসে কি না, আমার জানা নেই। আমার মনে হয়, এটা তো গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ডে উল্লেখ থাকা উচিত।” একদিকে যখন সমাপ্তি অনুষ্ঠান হচ্ছে। অন্যদিকে তখন অন্যান্য প্রেক্ষাগৃহের সামনে দর্শকদের লম্বা লাইন। এই বছর সেরা তথ্যচিত্রের শিরোপা পেল নেহা শর্মার ‘নাইব্রিয়াম দ্য আনসেটেলড শেড’। ২০টি ছোট ছবির মধ্যে বিচারকের বিচারে সেরার পুরস্কার পেয়েছে ‘শূণ্যতা’ ও ‘হাতের স্পর্শ’। সেরা ছোট ছবির পুরস্কার হিসেবে পাঁচ লক্ষ টাকা পুরস্কার পেলেন প্রত্যয় সাহা ‘ম্যায় মেহেবুব’ ছবির জন্য। তাজাকিস্তানের ছবি ‘ডোভ’-এর জন্য নেটপ্যাক পুরস্কার পেলেন মহিউদ্দিন মুজাফ্ফর। ভারতীয় ভাষার ছবির বিভাগে সেরা ছবি ‘ছাদ’ ও ‘সিকাইসাল’। হীরালাল সেন মেমোরিয়াল অ্যাওয়ার্ডে সেরা পরিচালকের শিরোপা পেলেন দীপঙ্কর প্রকাশ এবং সেরা ছবি ‘মুথাইয়া’। আন্তর্জাতিক বিভাগে সেরা ছবি ইরানের ‘সাইলেন্ট গ্লোরি’। পুরস্কার নিতে এসে পরিচালক নাহিদ হাসানজাদে বলেন, ‘আমাদের দেশে যেসব মহিলা নতুন জীবন ও স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছেন, এই ছবি তাঁদের জন্য।’ এই বছর সেরা ছবির শিরোপা পেল স্পেনের ‘আপন এন্ট্রি’ ও বাংলাদেশের “কুড়া পক্ষীর শূন্যে ওড়া”। যার পুরস্কার মূল্য ৫১ লক্ষ টাকা। একটি আন্তর্জাতিক সিনে অনুষ্ঠান এবং বাঙালিদের কাছে ফুটবল প্রিয় যে কতখানি তারই সাক্ষর হয় থাকল এইবারের এই অনুষ্ঠান। এ যেন সব খেলের সেরা বাঙালির তুমি ফুটবল তারই প্রমান মাত্র।








