মাফিয়াদের তান্ডবে উদ্বিগ্ন প্রশাসন বারাসাতে
দাবদাহ লাইভ, বারাসাত, বৈশাখী সাহাঃ সারা বাংলা জুড়েই যেন চলছে বালি মাটি মাফিয়াদের রাজ। প্রায়শই বিভিন্ন এলাকা থেকে সেই বহুচর্চিত মাফিয়া রাজের দৃশ্য সংবাদমাধ্যমের দ্বারা জনসম্মুখে প্রকাশিত হতে দেখা যায়। রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন এলাকার পুকুর, চাষের জমি থেকে মাটি কেটে নিয়ে পাচার করা, এ যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উত্তর ২৪ পরগণা জেলার বারাসাতেও এই মাফিয়া চক্র সক্রিয় হতে চলেছে বলে অভিযোগ উঠছে। মাটি পাচার চক্রের হাত থেকে রেহাই পেল না সরকারের অধীনে থাকা জমি। সেখানেও হাত বাড়িয়েছে তারা। সরকারি জমির একটি পুকুর থেকে দিনের আলোয় বালি মাটি কেটে পাচারের ঘটনা ধরা পড়ে জেলা সদর বারাসাতের বাদু এলাকা থেকে। ঘটনায় উদ্বিগ্ন স্থানীয় প্রশাসকমন্ডলী। উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাসাত পৌরসভার ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাদু মহেশ্বরপুরের একটি সরকারের অধীনস্থ জমিতে থাকা পুকুর থেকে বালি মাটি কেটে পাচার করার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় একদল অসাধু বালি মাটি পাচার চক্রের বিরূদ্ধে। কয়েকদিন যাবত রাতের অন্ধকারে ও প্রকাশ্য দিবালোকে বুলডোজার দিয়ে বালি মাটি কেটে নিয়ে পাচার করতে দেখা যায় বলে জানায় এলাকাবাসী। তারা এও জানায়, বহুদিন পূর্বে বারাসাতের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাদু রোড দখল করে সেখানে হাট বসিয়ে রীতিমতো তোলা আদায়ের অভিযোগ উঠেছিল। বর্তমানে সেই একই এলাকায় একটি স্কুলের পাঁচিল ভেঙে সরকারের অধীনস্থ পুকুর থেকে বালি মাটি কেটে পাচারের ঘটনায় ব্যপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে স্থানীয়দের মধ্যে। খবর পেয়ে পৌরসভার এক্সিকিউটিভ অফিসার মহঃ নাজির হোসেন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বারাসাত থানায় একটি এফআইআর দায়ের করেন। তিনি জানান, ওই এলাকার একটি স্কুলের পাঁচিল ভেঙে দিয়ে পৌরসভার অধিনস্থ জায়গার পুকুর থেকে এক অসাধু পাচার চক্রের বিরুদ্ধে বালি মাটি কেটে পাচার করার অভিযোগ ওঠায় তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এরপর পুরসভার পক্ষ থেকে থানায় একটি এফআইআর দায়ের করা হয়। যার ভিত্তিতে তদন্তে নেমেছে বারাসাত থানার পুলিশ। স্থানীয়দের কথায় ২১ নম্বর ওয়ার্ডটি দীর্ঘদিন যাবত বামেদের দখলে ছিল। সেই সময় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ওই এলাকায় ঘটেনি। এই প্রথম ওয়ার্ডটির দখল নেয় তৃণমূল। বর্তমানে ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ডঃ বিবর্তন সাহা। সরকারের অধীনস্থ প্রায় ৪ বিঘা জায়গায় থাকা পুকুর থেকে রাতের বেলা ও প্রকাশ্য দিবালোকে অবাধে চলছিল বুলডোজার দিয়ে বালি মাটি কেটে পাচারপর্ব। পুকুর থেকে মাটি তুলে পাচার করতে অসুবিধা হওয়ায় স্থানীয় এক স্কুলের পাঁচিল ভেঙে দিয়ে সেখান থেকে গাড়ি প্রবেশ করিয়ে বালি মাটি তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। মাটি পাচার প্রসঙ্গে গাড়ির চালকদের প্রশ্ন করা হলে তারাও কেউ বলতে পারেনি কার অনুমতিতে ওইরূপ কর্মকান্ড চলছে। স্থানীয়রা আরও জানান জমিটি সরকারের অধীনস্থ হওয়ায় মাটি কেটে পাচারের বিষয়ে তারা কেউ জানবার আগ্রহ প্রকাশ করেনি। কিন্তু স্কুলের পাঁচিল ভেঙে দেওয়ায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ হয়ে কাউন্সিলার এর কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি কিছুই জানেন না বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। সরকারি এলাকা থেকে বালি মাটি কেটে পাচারের ঘটনায় পুলিশ বা শাসকদলের কেউ-ই ওই স্থানে যায়নি বলেও অভিযোগ এলাকাবাসীর। সরকারের অধীনস্থ পুকুর থেকে কার অনুমতিতে মাটি পাচারের কর্মকাণ্ড চলছে তা নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয় স্থানীয়দের মনে। তবে শাসকদলের মদতেই বালি মাটি মাফিয়ারা ওইরূপ কর্মকান্ড করে চলেছে বলে অনুমান স্থানীয়দের। তাদের দাবি অবিলম্বে মাটি কেটে পাচারের কাজ বন্ধ করা হোক এবং স্কুলের পাঁচিল মেরামত করে দেওয়া হোক। পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের সামনে বালি মাটি মাফিয়াদের রাজ এর ঘটনা তুলে ধরায় রাতের বেলা তাদের উপর হামলা হতে পারে বলেও আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী। এই প্রসঙ্গে এলাকার কাউন্সিলর ডঃ বিবর্তন সাহা জানান, পেশায় একজন চিকিৎসক, কর্মসূত্রে তাকে অনেক সময় বাইরে থাকতে হয়। ফলে এই বৃহৎ এলাকার সবকিছু দেখভাল করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে এও বলেন, মাটি পাচার কান্ডটি রাতের বেলায়-ই হয়েছে, দিনের বেলায় ওইরূপ ঘটনা ঘটেছে বলে তার জানা নেই। তবে ওইরূপ কর্মকান্ডের সাথে যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। এই প্রসঙ্গে বিজেপির বারাসাত সাংগঠনিক জেলা সভাপতি তাপস মিত্র জানান, বালি মাটি পাচারের ঘটনা এই জেলায় নতুন নয়। বীরভূম, বর্ধমান সহ গোটা বাংলা জুড়ে জমি-বালি-মাটি মাফিয়াদের রাজ চলছে। বাংলায় লুটেপুটে খাচ্ছে তারা। কারন তারা বুঝে গেছে তাদের দিন ঘনিয়ে এসেছে,পশ্চিমবঙ্গে তারা আর ক্ষমতায় থাকতে পারবেনা। তাই তৃনমূলের নেতারা তাদের পকেট ভারী করতে অসৎ উপায় অবলম্বন করে কোটি কোটি টাকা উপার্জন করে পকেট ভরছে বলে অভিযোগ আনেন। তিনি আরও বলেন, ২১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার ওই ওয়ার্ডেরই কনভেনার এবং বারাসাত তৃণমূল কংগ্রেসের ছাত্র নেতা। কাউন্সিলার নিজে ওই ঘটনার সাথে জড়িত বলে দাবি করেন তিনি। একইসাথে তিনি বলেন, সারা বাংলা জুড়ে লুটেদের রাজ চলছে। কে কত ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা বর্তমান শাসকদলের মধ্যে প্রকটভাবে দেখা যাচ্ছে বলে জানান তাপস মিত্র। বারাসাত পৌরসভার পৌরপ্রধান অশনি মুখার্জি অবশ্য জানান, মাটি পাচারের ঘটনাটি যে ঘটেছে তা সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু এই ঘটনায় কে বা কারা যুক্ত তা জানা যায় নি। তবে পুলিশ ইতিমধ্যে ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত। তদন্ত করে দোষীদের আটক করবে পুলিশ। যদি তাদের দলের কেউ ওই বালি মাটি পাচার চক্রের সাথে যুক্ত থেকে থাকে, তাহলে আইনের চোখে সে-ও অপরাধী।


















