Banner Top
দাবদাহ লাইভ, কোলকাতা, ঋদ্ধি ভট্টাচার্যঃ ৭১টি দেশের ১৬৯৮টি ছবি জমা পড়ে। বাছাই করে দেখানো হচ্ছে ১৬৩টি ছবি। ৪৬টি বিদেশি ছবি, ১০৪টি ফিচার ফিল্ম, ৫৯টি স্বল্প দৈর্ঘ্যের ছবি ও তথ্য চিত্র। কোলকাতায় অনুষ্ঠিত ২৭তম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৭দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানে ১০টি প্রেক্ষাগৃহে ছবি দেখছেন চলচ্চিত্রপ্রেমীরা। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়। মঞ্চে টালিগঞ্জের এক ঝাঁক শিল্পীদের সঙ্গে ছিলেন রাজ্যের শাসক দলের সদ্য নির্বাচিত সাংসদ জনপ্রিয় বলিউড অভিনেতা শত্রুঘ্ন সিনহা। মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে বলেন, বাংলা ছবিতে লগ্নী করার জন্য মুম্বাই প্রযোজকদের অনুরোধ জানাতে । উৎসবের সূচনা হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের অরণ্যের দিনরাত্রি ছবি দিয়ে । ২০২১-এ সত্যজিৎ রায়ের জন্ম শতবার্ষিকী স্মরণে এই শ্রদ্ধাঞ্জলি।   সত্যজিৎ রায়ের পাশাপাশি হাঙ্গেরির পরিচালক মিকলোস ইয়াঞ্চ, বিশ্বখ্যাত অভিনেতা জাঁ পল বেলমন্ডো, জাঁ ক্লদ ক্যারিরি, বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, দিলীপকুমার, স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত, সুমিত্রা ভাবে, লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, বাপি লাহিড়ী ও অভিষেক চট্টোপাধ্যায়কেও শ্রদ্ধা জানানো হয় তাঁদের ছবি দিয়ে এবং তাদের ওপর বিশেষ প্রদর্শনী আয়োজন করা হয় গগনেন্দ্র প্রদর্শন প্রাঙ্গনে।  এইবারের  সত্যজিৎ রায় সড়ক বক্তৃতা দেন পরিচালক সুজিত সরকার। এভাবে সড়ক বক্তৃতায় বক্তা সংযোজিত করেছে নানাবিধ আত্ম প্রসঙ্গ। সত্যজিতের সঙ্গে বেড়ে ওঠা এবং বাঙালিয়ানার অনুসন্ধান সুজিত সরকারের কাছে বারবার উঠেছে অপরিহার্য। তার কণ্ঠে আক্ষেপের সুরে ভেসে ওঠে তিনি পুরোপুরি বাঙালি হয়ে ওঠেনি সেই কারণ। মুম্বাইতে তার দপ্তরে বেশ কয়েকটি রায় সাহেব- এর ছবি পোস্টার রয়েছে। তার ছবি ইউনিট এ কাজ করার জন্য যারা আসেন তাদের ওপর একটি পরীক্ষা চালানো হয় এবং যারা বলেন দপ্তরে উপস্থিত সত্যজিৎ রায় প্রস্তাবের উপস্থিত ছবিগুলি দেখেননি তাদের তিনি সচরাচর ইউনিটের স্থান দেন না। বহু কথার মধ্যে দিয়ে তার বক্তব্যে তিনি সত্যজিৎ রায় সৃষ্টিশীলতা কে মেলে ধরেছেন অন্যদিকে অন্তরালে থেকে কাজ করে গেছেন বিজয় রায়।  এছাড়াও তার বিভিন্ন সব কাজে মাপ তুলে ধরেছেন তিনি তার বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে এবং মূলত অপুর ক্রায়ো ওপর তিনি একটি বিশেষ আলোচনা করেন। তার বক্তব্যে মূলত বলতে চেয়েছেন মানুষকে বারবার সত্যজিৎ রায়ের ছবির উপর ফিরে যেতে হবে সমস্তটা একত্রে বুঝবার জন্য। এইগুলোর সাথে ও নন্দন চত্বরে জমে উঠেছিল সিনে আড্ডা এবং সেমিনার। এমনই একটি সেমিনারের মূল বক্তব্য ছিল অভিনেত্রীরা কি শুধুই মনমোহিনী?- এমন গভীর একটি আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন ডক্টর মোহন আগাসে, পাওলি দাম, রাইমা সেন ও পরিচালক পাভেল। এই বক্তব্যে উঠে আসে প্রথম মহিলা সিনেমা শিল্পী দেবিকা রানী এবং তার ভার্সেটাইল গ্ল্যামার বিচ্ছুরণ এর কথা প্রবল  বাগ্মিতায় তুলে ধরেন পরিচালক সুদেষ্ণা। দেবিকা রানি জার্মানিতে গিয়ে ফিল্ম মেকিং নিয়ে রীতিমতো পড়াশোনা করে এসেছিলেন। সেই সময়টা এত মসৃন ছিল না। মেয়েদের সিনেমায় নামা ও মঞ্চে ওঠার এই ধরনের নিন্দাসূচক কথা বলা হত। দেবিকা রানী তার শিক্ষা বৈদুর্য্য সম্ভার নিয়ে সেই মিথ ভাঙ্গেন। সুমিত্রা ভাবের ফিল্ম নির্মাণের কথা প্রসঙ্গে ডাক্তার মোহনা আগাসের প্রথমেই মনে পড়ে তার সুনিপুণ গবেষণার কথা।  ছবি তৈরির ক্ষেত্রে গবেষণার গুরুত্ব কতখানি তারই দৃষ্টতা রচনা করেছেন তিনি। 'দিঠি' ছবিতে এক ধরনের পাবলিক এনগেজমেন্টের অপূর্ব নিদর্শন রয়েছে। সমাজে বিভিন্ন অন্ধকার বিষয় নিয়ে পরিচালক গবেষণা করে বাবার ছবি করতে গেছেন। মহারাষ্ট্রের পান্দ্হারপুরের তীর্থযাত্রী এই ছবিতে উপস্থিত রয়েছেন কিন্তু ছবিটি আদৌ ধর্মীয় বিষয়কেন্দ্রিক নয়। সেই সঙ্গে রয়েছে সমাজে প্রান্তিক মানুষের কথা। অর্থাৎ তিনি বোঝাতে চেয়েছেন একটি ছবি করতে  গবেষণা করা অত্যন্ত জরুরি। এবছর সিনে আড্ডা ছিল প্রতিবছর থেকে একটু আলাদা রকমের। ফাঁকা ময়দানে বদল এবছর সেটি হয় শীততাপ নিয়ন্ত্রিত সভাঘরে। প্রথমটি বিষয় ছিল সিনেমা: পরিচালক দর্শক দুজনেরই কিনা? এমন একটি কৌতুহল বিষয় বক্তব্য রেখেছিলেন একেনবাবু খ্যাত অনির্বাণ চক্রবর্তী এবং এছাড়াও ছিলেন পরিচালক গৌতম ঘোষ ও অভিনেত্রী পাওলি দাম। এই আড্ডার আরেকদিনের বিষয় ছিল "সিনেমার জন্য গান না গানের জন্য সিনেমা"- তাতে বক্তা ছিলেন গায়িকা জোজো, রাঘব চট্টোপাধ্যায়, অনুপম রায় এবং মনোময় ভট্টাচার্য্য। প্রত্যেকে যে যার বক্তব্য পেশ করার পর গায়ক মনোময় ভট্টাচার্য বললেন দুটোই একে অপরের পরিপূরক বা স্বামী স্ত্রী বলে ধরা যেতে পারে। উৎসবের শেষ দিন একটি বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করা হয় যেখানে সত্যজিৎ রায়ের সাথে কাজ করেছেন এমন সমস্ত শিল্পীদের সংবর্ধিত করা হয় এবং সেটি সত্যজিৎ জন্মশতবর্ষকে উৎসর্গ করে এমনই অভাবনীয় পরিকল্পনা তাক লাগিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পথের পাঁচালীর অপু, সোনার কেল্লা মুকুল এবং তোপসে, মমতা শংকর, রঞ্জিত মল্লিক , বরুণ চন্দ সহ আরো অনেক বিশিষ্টজনেরা। উৎসবের শেষ মুহূর্তে তাকিয়ে থাকে সমস্ত সিনেমা প্রেমী মানুষেরা এবং সেই সূত্র ধরে প্রতিবছরের মতো এবছরও রয়েল বেঙ্গল টাইগার অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হল। সেরা ভারতীয় তথ্যচিত্র হিসেবে নির্বাচিত হল পরিচালক সুচি প্রসাদের পরিচালনায় নিককে মানু দি নিক্কি কাটাব। সেবা স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি হিসেবে নির্বাচিত হল পরিচালক সৃষ্টিপাল সিং এর পরিচালনায় গেরু পাত্র। এশিয়ার মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে নির্বাচিত হল পরিচালক অভিনন্দন ব্যানার্জি পরিচালিত মানিকবাবুর মেঘ। ভারতীয় ভাষার ছবির মধ্যে স্পেশাল যুরি আওয়ার্ড হিসেবে নির্বাচিত হল অনুরাগ পার্টি পরিচালিত ছবি প্রাপ্তি। সেবা নির্বাচক হিসেবে মনোনীত হলেন পরিচালক ইসরাত খান তার ছবি গুটলি লাড্ডু। তার দখলে রইল হীরালাল সেন মেমোরিয়াল আওয়ার্ড। সর্বশেষে এবছর রয়েল বেঙ্গল টাইগার অ্যাওয়ার্ড টি পেলেন পরিচালক গৌতম ঘোষের ছেলে ঈশান ঘোষ, তার ছবি ঝিল্লির জন্য। এর সাথে তিনি পেয়ে গেলেন ৫১ লক্ষ টাকা এবং সোনার ট্রফিটি। উৎসবের শেষ প্রাঙ্গণে এসে যেন মনে হলো বাবার দেওয়া মশালটা সুযোগ্য পুত্র হাতে ঠিক ভাবেই গেছে এবং তার থেকে আরো ভালো ছবি দেখার আশা নিয়েই দর্শকরা আসন ছাড়লো পরের বছরের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের জন্য।
Banner Content
Dabadaha is a News Media House under the Brand of Dabadaha Live ( দাবদাহ লাইভ) via Website as WEB NEWS

0 Comments

Leave a Comment