রক্তকরবীর সেই নীল ঘোড়া নব আঙ্গিকে
দাবদাহ লাইভ, উত্তর ২৪ পরগনা, নিজস্ব সংবাদদাতাঃ ১৩ নভেম্বর, ২০২৫—গিরিশ মঞ্চের সেই সন্ধ্যায় দর্শক যেন ধীরে ধীরে পা রাখলেন এক অনির্বচনীয়, প্রতীক-নির্ভর, অথচ চমৎকারভাবে সমসাময়িক বাস্তবতায়। “দমদম রক্তকরবী নাটক আকাদেমি”-র নতুন প্রযোজনা THE BLUE HORSE শুরু থেকেই তার ভাবনাকে স্পষ্টভাবে মেলে ধরে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এই দলের প্রস্তুতি, সংহতি এবং নন্দনচেতনা যে কতখানি পরিণত হয়েছে, এই নাটক তার উজ্জ্বল প্রমাণ। গল্পের কেন্দ্রে সোমনাথ রায়—একসময় রেস খেলার নেশায় সবকিছু হারানো এক মানুষ। বহুদিন পর তিনি ফের প্ররোচিত হন মাঠে ফিরতে। ভাগ্যের পরিহাসে, বা অলৌকিক দান হিসেবে, তিনি হাতে পান এমন এক সংবাদপত্র যা শনিবারের রেসের ফলাফল ছাপা অবস্থাতেই তাঁর কাছে পৌঁছে যায় শুক্রবারেই। সেই অদ্ভুত ভবিষ্যদ্বাণীমূলক খবরের কাগজ তাঁকে আবার জয়ের পথে নিয়ে যায়—অর্থ ও সাফল্য বাড়তে থাকে, কিন্তু ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে তাঁর পরিবার, দূরে সরে যেতে থাকে সম্পর্কের সুতো। আর এক শুক্রবার তিনি সেই খবরের কাগজেই দেখতে পান—পরদিন তাঁর মৃত্যুসংবাদ। মৃত্যুকে একদিন আগে জেনে ফেলার মানসিক টানাপোড়েন নাটকের ভিতরকার অস্তিত্ববাদের আলোচনাকে আরও ঘনীভূত করে। এই প্রযোজনার শক্তি নিঃসন্দেহে অভিনয় শিল্পীদের হাতে। প্রিয়বন্ধু মজুমদারের সংযত, ওনার অনুভূতিপূর্ণ অভিনয় নাটটিকে গভীর মানবিক রূপ দেয়। করবী নন্দী মজুমদার ও সুস্মিতা সিংহ রায় তাদের দৃঢ় কণ্ঠ, শরীরীভাষা ও উপস্থিতিতে দৃশ্যগুলোকে মজবুত করেছে। তুহিন দাস ও অন্বয় ব্যানার্জি স্বচ্ছন্দ ও পরিমিত অভিনয়ে নিজের জায়গা স্পষ্ট করেছেন। কৈরবী সেনগুপ্ত ও সাগর ঘোষের অভিনয়ে তরুণ প্রজন্মের উদ্যম ও সম্ভাবনার দারুণ পরিচয় মিলেছে। সুস্মিতা কর এবং শান্তুনু তালুকদার চরিত্রের সূক্ষ্ম আবেগগুলো অনায়াসে ফুটিয়ে তুলেছেন। আর অভিনেতা-পরিচালক হিসেবে বোধিসত্ত্ব মজুমদার নিঃসন্দেহে প্রযোজনার অন্যতম ভিত্তি—তাঁর অভিনয়ের চাপানউতোর মাঝে চরিত্রের জটিলতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সৈনিক ঘোষের সংগীত পরিকল্পনা নাটকের ছন্দকে বহন করেছে এক নীরব সঙ্গীর মতো—কখনও কম্পমান পরিবেশ, কখনও প্রবল গতি আনতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে। পল্লব জানার আলো নকশা, বিশেষত নীলের বিভিন্ন স্তর, নাটকের প্রতীকী ভাবনাকে আরও স্পষ্ট, আরও ধারালো করে। প্রিয়বন্ধু মজুমদারের সংযত কিন্তু প্রভাবশালী মঞ্চ-নির্মাণ, অমৃতা মিত্রের মেকআপ এবং সুস্মিতা সিংহ রায়ের কস্টিউম—সব মিলিয়ে নান্দনিকতার দিক থেকেও প্রযোজনাটি সমৃদ্ধ। তবে মাঝামাঝি দু-একটি দীর্ঘ সংলাপভিত্তিক দৃশ্যে গতি খানিকটা শ্লথ হয়; কয়েকটি ট্রানজিশনেও আলো-সঙ্গীতে সামান্য অসামঞ্জস্য থাকে। কিছু জায়গায় অবিনয় খানিক ছানাকাটা লাগে, খানিক বোরডাম আনে। কিন্তু এই ক্ষুদ্র বিচ্যুতিগুলো সামগ্রিক অভিজ্ঞতাকে খুব একটা ব্যাহত করে না—বরং ভবিষ্যতের শোতে উন্নতির দিশা দেখায়। সব মিলিয়ে বলা যায়, THE BLUE HORSE একটি সুনির্মিত, দৃপ্ত ও আধুনিক প্রযোজনা। পুরনো নাট্যগ্রন্থ নতুন চোখে দেখা—এই দলের ক্ষমতা আবারও মঞ্চে প্রমাণিত। সেই রাতে গিরিশ মঞ্চে নীল ঘোড়ার দৌড় অনেক দূর পর্যন্ত প্রতিধ্বনিত হয়েছে।
রক্তকরবীর সেই নীল ঘোড়া নব আঙ্গিকে
0%

















