Banner Top

জলেশ্বরের মাহাত্ম্যপূর্ণ গাজন উৎসব

                                                                      দাবদাহ লাইভ, উত্তর ২৪ পরগণা, বৈশাখী সাহাঃ  শিব পূজার মাহাত্ম্য সারা ভারতবর্ষ তথা বিশ্বব্যাপী প্রচলিত। শিব পূজা বলতে সর্বাগ্রে উঠে আসে ভারতের বিভিন্ন স্থানে সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের নাম। এছাড়াও বিশ্ববাসীর কাছে বিভিন্ন স্থানে প্রতিষ্ঠিত জাগ্রত বহু শিবলিঙ্গের মধ্যে উত্তর ২৪ পরগনার জলেশ্বর শিব মন্দির অন্যতম। জলেশ্বর হল- ইতিহাস প্রসিদ্ধ সুপ্রাচীন একটি জনপদ। ১৬০৬ সালে জলেশ্বর নদীয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর তৎকালীন নদীয়ার জমিদার ‘ভবানন্দ মজুমদার’ পলাশীর যুদ্ধের পর ১৭৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীকে সমগ্র ২৪ পরগনা জেলা উপহার দেন। সেই সময় জলেশ্বর অবিভক্ত ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ব্রিটিশ শাসনকালে জলেশ্বর সহ সমগ্র অঞ্চলের জমিদার হন গোবরডাঙ্গার জমিদারেরা। সেই গোবরডাঙ্গার জমিদারেরাই জলেশ্বর শিব মন্দিরের নামে ষাট বিঘা জমি ‘দেবোত্তর সম্পত্তি’ হিসেবে দান করেন। জানা যায়, সেন রাজাদের রাজত্বকালে জলেশ্বরে শিব পুকুরের খননকার্য ও মন্দিরের সংস্কার হয়। জলেশ্বর শিব মন্দিরের জন্য জমি প্রদানের পাশাপাশি, ওই ‘দেবোত্তর সম্পত্তি’ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কিছু ‘নিঃশুল্ক জমি’ সহ জমিদারি সেরেস্তার এক কর্মচারীকে জলেশ্বরে পাঠান গোবরডাঙার জমিদারেরা। কাল ক্রমে সেই ব্যক্তির বংশধরেরা নিজেদের নিঃশুল্ক জমি ছাড়াও, ওই ‘দেবোত্তর সম্পত্তি’ ভোগদখল করতে শুরু করে। এহেন ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে সম্প্রতি জলেশ্বর সহ পার্শ্ববর্তী আটটি গ্রামের মানুষ জলেশ্বর শিব মন্দির ও পর্যটন উন্নয়ন কমিটি গঠন করে সেই  ‘দেবোত্তর সম্পত্তি’ উদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ব্রতী হয়েছেন। বর্তমানে গাইঘাটা থানার ২২ নম্বর মৌজা হল জলেশ্বর। যার মোট আয়তন ৬৪.৬৭ হেক্টর। ওখানে ২০৪৪ নম্বর দাগে ৪ একর ৪০ শতক জায়গা জুড়ে অবস্থিত শিব পুকুর, আর ১.১৬ একর জুড়ে রয়েছে সু-বিশাল শিব মন্দির। এই মন্দিরের মাহাত্ম্য স্থানীয় সহ সাধারণের মুখে প্রচার পেয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। জলেশ্বরে প্রধান উৎসব প্রসঙ্গে মন্দির কমিটির সম্পাদক শম্ভুনাথ মন্ডল ও মেলা কমিটির সম্পাদক অপর্না দাসের কথায়, এই মন্দিরের শিব ঠাকুর ১২ মাস জলে থাকেন। গাজনের সময় মন্দির অনন্য সাজে সু-সজ্জিত হয়ে ওঠে। মন্দির সংলগ্ন আম বাগানে বসে জমাটি মেলা। সেখানে নানান দ্রব্যের পশরা সাজিয়ে বসেন ব্যবসায়ীরা। প্রথম থেকেই এই মন্দিরের উৎসব ও রক্ষণাবেক্ষণে অংশগ্রহণ করে চলেছেন মন্দির সংলগ্ন জলেশ্বর, চন্ডীগড়, শিমুলিয়া, নারিকেলা বাঘনা, গোপালপুর, কেমিয়া ও আমকোলা – এই অষ্ট গ্রামের মানুষজন। জলেশ্বর এর গাজন উৎসবে পূজার সমস্ত রকম সামগ্রী যোগান দেন বিভিন্ন স্থানের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ। পূজার প্রায় সব অনুষ্ঠান বৌদ্ধ রীতি মেনে সম্পাদন করা হয়। জলেশ্বরে মহা ধুমধাম করে পালন করা হয় গাজন উৎসব। ওই সময় বহু দূর দূরান্ত থেকে আগত বহু সাধু সন্ত ও ভক্তবৃন্দের উপস্থিতিতে মন্দির প্রাঙ্গণ হয়ে ওঠে জমজমাট। আর শিবের মাথায় জল ঢালার জন্য অদ্ভুত উন্মাদনা মানুষের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবছর চৈত্রের তৃতীয় সপ্তাহের সোমবার সন্ন্যাসীরা শিব পুকুর থেকে জলেশ্বর শিবকে তুলে পুকুর পাড়ে পূজা করে ঠাকুরকে মন্দিরের প্রতীক্ষালয়ে নিয়ে যান। জানা যায়, হাজারো সন্ন্যাসীর কণ্ঠে বাবা জলেশ্বর এর ‘শিবম মহাদেব’ গর্জন করা থেকেই হয় গাজনের উৎপত্তি। প্রাচীন রীতি অনুসারে তারকেশ্বরের শিবকে যেমন শেওড়াফুলির ঘাট থেকে গঙ্গা জল নিয়ে স্নান করানো হয়, তেমনি ওই দিনই সন্ন্যাসীরা সমবেতভাবে শিবের নাম গর্জন করতে করতে পায়ে হেঁটে জলেশ্বর এর শিব ঠাকুরকে মাথায় নিয়ে, গঙ্গাস্নানের উদ্দেশ্যে নিয়ে যান হালিশহরের রামপ্রসাদ ঘাটে। স্নানান্তে হয় পূজাপাঠ। এরপর পুনরায় শিবকে নিয়ে জলেশ্বরে ফিরে এসে সন্ন্যাসীরা বাবা বুড়ো শিবকে মাথায় নিয়ে আট গ্রাম পরিক্রমন করেন। এরপর শিব ঠাকুরকে নিয়ে যাওয়া হয় শিব পুকুরের পাড়ে অবস্থিত মন্দির প্রতীক্ষালয়ে। তারপর বিশেষ মর্যাদাসহ ওই শিব পুকুরে চন্ডীগড়ের সন্ন্যাসীরা প্রথমে স্নান করেন, তারপর অন্য সন্ন্যাসীরা স্থানে নামেন। এভাবে সমাপ্ত হয় ‘ঘাট সন্ন্যাস’ পর্ব। পরের দিন হয় ‘নীল পূজা’। নীল পূজার পরের দিন চৈত্র সংক্রান্তিতে হয় ‘চড়ক পূজা’। ১লা বৈশাখের দিন হয় শিব ঠাকুরের বিশেষ অন্ন ভোগ। সন্ন্যাসীরা এদিন তেল হলুদ মেখে স্নান করে সন্ন্যাসব্রত শেষ করেন। শিব ঠাকুরের পূজা পর্ব শেষে মন্দিরের মূল সন্ন্যাসী বাবা বুড়ো শিব ঠাকুরকে পুনরায় জলের মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে আসেন। এরপর অন্য সন্ন্যাসীরা অন্ন ভোগ জলে দিয়ে গাজন উৎসব সমাপ্ত করেন। পুকুর থেকে শিব তোলা এবং জলে শিবকে রেখে আসা- যেন এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত। সেই মুহূর্তে পুকুরের চারিপাশে উপচে পড়া মানুষের ভীড় পরিলক্ষিত হয়। এভাবে প্রতি বছর সাড়ম্বরে পালিত হয় জলেশ্বরে ‘বুড়ো শিবের পূজা’ উপলক্ষে ‘গাজন উৎসব’।
জলেশ্বরের মাহাত্ম্যপূর্ণ গাজন উৎসব
User Review
0% (0 votes)
Banner Content
Dabadaha is a News Media House under the Brand of Dabadaha Live ( দাবদাহ লাইভ) via Website as WEB NEWS

0 Comments

Leave a Comment